শুক্রবার-৩ জুলাই ২০২০- সময়: রাত ১:২৪
বিরামপুরে পৌর মেয়র সহ ৭ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে বিরামপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী পালিত বিরামপুরে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আটক বিরামপুরে লাখো কণ্ঠে ৭ মার্চের ভাষন পাঠ গুরুদাসপুরে এক বৃদ্ধা খুন বিরামপুরে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত কাটলা হলি চাইল্ড স্কুল বিরামপুরে মুজিব বর্ষ উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান দিদউফ বিরামপু‌রে দুস্থ শীতার্ত‌দের মা‌ঝে শীতবস্ত্র বিতরন বিরামপুরে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ও জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণ গণনার সূচনা বিরামপুরে ১২ হাজার শিশুকে ভিটামিন এ প্লাস খাওয়ানো হয়েছে

ফিচার newsdiarybd.com:

জাকারিয়া মন্ডলের পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য

 
এসএম আব্বাস-ভ্রমণ কাহিনীতে সাধারণত গৎবাঁধা তথ্যের গতানুগতিক রূপ পাওয়া যায়। কোথায় গেলাম, কী করলাম, কী খেলাম, থাকার জায়গাটা কেমন ইত্যাদি তথ্যের সন্নিবেশেই এ ধরনের লেখার ভিত রচিত হয়ে থাকে। কিন্তু ‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ গ্রন্থটি চিরচেনা সেই কাঠামো ভেঙে বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে।

গ্রন্থটির লেখক জাকারিয়া মণ্ডল পেশায় সংবাদকর্মী। তিনি যতটা না সংবাদ সংগঠক, তার চেয়েও বেশি রিপোর্টিং মানসিকতা ধারণ করেন। ‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ বইয়ে তাই রিপোর্টিং ও ফিচারের অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

পেশাগত প্রয়োজনে পারস্য উপসাগরের দ্বীপদেশ বাহরাইন, দক্ষিণ চীন সাগরের পশ্চিমপাড়ের মালয় উপদ্বীপ ও পূর্ব পাড়ের বোর্নিও দ্বীপ, হিমালয় কন্যা নেপাল এবং প্রতিবেশী ত্রিপুরার আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন জাকারিয়া মণ্ডল। আয়েশি পর্যটকের আড়মোড়া ভেঙে হয়ে উঠেছেন পরিশ্রমী পরিব্রাজক। সরেজমিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিংবদন্তি, ঐতিহ্য, ইতিহাস, সাহিত্য ও সভ্যতার গল্প মিশিয়ে নিজস্ব ঢঙে বুনেছেন ভ্রমণ সাহিত্য। ফাঁকে ফাঁকে বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, মহাপুরাণ, উপপুরাণের আখ্যান ও উদ্ধৃতি বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে।

‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’তে মোট ১২টি ভ্রমণ গল্প স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি মালয় উপদ্বীপের, চারটি ত্রিপুরার ও অবশিষ্ট তিনটি বোর্নিও, বাহরাইন ও নেপালের প্রেক্ষাপটে রচিত। প্রতিটি গল্পেই জ্বলজ্বল করছে অগণিত এক্সক্লুসিভ রিপোর্টের সম্ভাবনা। যেমন বাহরাইনের গল্পে মেসোপটেমীয় ও অ্যাসেরিয় সভ্যতার মিশেলে গড়ে ওঠা দিলমুন সভ্যতার প্রেক্ষাপট ও বিবর্তন, মালয়েশিয়ায় ভারতীয়দের অভিবাসন, বোর্নিওতে আত্মার উপাসক মুসলিম বাজাউ সম্প্রদায়, নেপালের স্বয়ম্ভু মন্দিরের বিবর্তন ও সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশের ময়নামতি ও পাহাড়পুরের প্রতিচ্ছায়ায় ছাওয়া ত্রিপুরার পিলাক নগর নিয়ে নিঃসন্দেহে বড় বড় রিপোর্ট হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের ভুবনেশ্বরী, মাতাবাড়ির ত্রিপুরেশ্বরী, কসবার কমলেশ্বরী নিয়েও দারুণ রিপোর্ট করা যায়।

চোখে দেখা বিবরণে কীভাবে তথ্যের সমাবেশ ঘটাতে হয় তার অনন্য নজির হয়ে উঠেছে ‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ গ্রন্থটি। তবে অনেক বিষয়ে গবেষণালব্ধ অজানা বিষয়ের সমাবেশ ঘটালেও কিছু কিছু প্রসঙ্গ ইচ্ছে করেই অসমাপ্ত রেখে দিয়েছেন লেখক। এতে পাঠক মনের তৃষ্ণা আরও বেড়েছে নিঃসন্দেহে।

‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ গ্রন্থে অনেক কঠিন বিষয়কে সহজ ছন্দে গেঁথেছেন লেখক। তার বিবরণ সাবলীলভাবে এগিয়ে চলে বাঁধ ভাঙা স্রোতস্বিনীর মতো। একবার পাঠের মধ্যে ঢুকে পড়লে মগ্ন হয়ে পড়তে হয়। বইয়ের পাতায় ফুটে উঠতে থাকে একের পর এক ভ্রমণ দৃশ্যের প্রাণবন্ত সব ছবি।

সব গল্পেই প্রাসঙ্গিক ও দুর্লভ আলোকচিত্রের উপস্থিতিতে বইটি আরও দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। সহায়িকা হিসেবে ব্যবহার করা বিভিন্ন গ্রন্থ ও সূত্রের উদ্ধৃতি গ্রন্থটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। গত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশক শুদ্ধপ্রকাশ। চার রঙে ছাপা বইটির দাম ২৫০ টাকা। বিভিন্ন অভিজাত বইয়ের দোকান ছাড়াও অনলাইনে রকমারি ও ইত্যাদি শপে বইটি পাওয়া যাচ্ছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্ষ্য

মাদকাসক্তি সমাজ উন্নয়নের পথে বড়ো অন্তরায়। আধুনিক বিশ্বে আদর্শ নাগরিক ও সুশীল সমাজ বিনির্মাণে যতগুলে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তন্মধ্যে মাদকাসক্তি অন্যতম । সর্বগ্রাসী মাদকাসক্তির থাবা আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ক্যানসারের গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।

আবাল-বৃদ্ব-বনিতা আজ মাদকাসক্তির মনণ ছোবলের শিকার। সভ্য জগতের একটি দেশও খূঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে মাদকাসক্তির বিষবাস্প ছড়িয়ে পড়েনি।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও বহুলভাবে ব্যবহৃত মাদকাবস্তুুটির নাম ইয়াবা। নারী পুরুষ, যুবক- যুবতী, ছাত্রশিক্ষক, ডাক্তার, ব্যবসায়ী,বেকারঅনেকেই এতে আসক্ত। একবার এর নেশা কাউকে পেয়ে বসলে আর রক্ষা নেই। ছেলেমেয়ে, মা-বাবা, বাড়িঘর , ব্যবসা –বাণিজ্য কোনও কিছুর মায়া তাদের আর ধরে রাখতে পারেনা। কেবলই নেশার মোহজাল তাদের অন্য এক জগতে টেনে নিতে থাকে অনবরত।

মাদকবিরোধী অভীযান চললেও ইয়াবার বাণিজ্য দিব্যি চলছে। শুধু কিছূ কৌশলের পরিববর্তন হয়েছে মাত্র। এখন পায়ুপথেও ইয়াবা পাচার হচ্ছে।

ইয়াবা থাই শব্দ। এর অর্থ ক্রেজি মেডিসিন বা পাগলের ওষুধ। মূল উপাদান মেথ্যামোফিটামিন। এটি ভয়াবহ মাদক যা ব্রেইন ও হার্টসহ দেহের যেকোনও অঙ্গের বারোটা বাজাতে পারদর্শী।

দ্বিতীয় বিশ্বদ্ধের সময় জার্মান সৈনিককদের নিদ্রা, ক্ষুধা ও ক্লান্তিহীন করতে এ মেথ্যামফিটামিন সেবন করানো হতো। এতে সৈনিকেরা দুঃসাহসী, ক্লান্তিহীন ও আগ্রাসী হয়ে উঠতো। ষুদ্ধশেষে ভয়ংকর হয়ে যেতো। একে অপরকে গুলি করে মারতেও ছাড়তো না। অনেকে আতœহত্যা করতো। এজন্য এটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু অনেক দেশ মেথ্যামফিটামিন উৎপাদন অব্যাহত রাখে।

ইয়াবাখোর বা ব্যবসায়ীরা দঃসাহসী, দুদার্ন্ত, জীবনের প্রতি অনাগ্র হয়ে পড়ে। তাই এরা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলে প্রতিপক্ষকে খুন করতে কিংবা নিজেরা মরতেও দ্বিধা করে না। এ কারনে সমাজে নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ও হত্যাকান্ডসহ নানা অপরাধ বাড়ছে।

ইয়াবা আসক্তরা জন্মদাতা বাবা – মাকে খুন করতেও দ্বিধা করেনা। তার প্রমান রেখে গেছে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান এবং স্ত্রী স্বপ্না রহমানের আদরের সন্তান অক্সফোর্ড স্কুলের ‘ও’ লেবেলের ছাত্রী ১৭ বছরের মেয়ে ঐশি রহমান। ইয়াবা খোরদের মনুষ্যত্ব বলে কোন কিছু থাকে না। খুনের পর খুন কিংবা অপরাধ করলেও এনিয়ে তাদেও ভিতরে কোন অনুশোচনা হয় না।

ইয়াবার নেটওয়ার্কের উৎপত্তি মিয়ানমার থেকে। বাংলাদেশে ফেনসিডিলের অবাধ অনুপ্রবেশের জন্য দায়ী সীমান্তের ওপারে ভারতে গড়ে ওঠা অসংখ্য ফেনসিডিল কারখানা। মাদকের ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে অনেকেই কিন্তুু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পুরো সমাজ। এটা গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পেরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিবাাদের মতো মাদক সম্পুর্ণ নির্মুল করার ঘোষনা দিয়েছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও র‌্যাবকে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর সেই নির্দেশ অনুযায়ী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান গত ১৫ই মে ২০১৮ থেকে সারা দেশ জুড়ে জোরেশোরে শুরু হয়েছে।

খুলনায় এক অনুষ্ঠানে ২৩ মে ২০১৮ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, সব গোয়েন্দা বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জুর্ণাঙ্গ তালিকা দিয়েছি। কারা মাদকের সঙ্গে জড়িত, কারা মাদকের ব্যবসা করেন। আমরা তাদের বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে যে তালিকা রয়েছে , সে অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনী তাদের খুঁজছে। র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় নেওয়া হবে। সে গড়ফাদার হোক বা অন্য কেউ।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত, কারা সেখানে অর্থলগ্নি করেছে, কারা বাসা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছে তাদের তালিকা অচিরেই প্রকাশ করা হবে। মাদকের যারা গডফাদার, আইনের আওতায় নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিকভাবে তাদের বয়কট করার আবান জানানো হবে । (সূত্র; দৈনিক সমকাল ২৪ মে ২০১৮)

তথ্য সূত্রে জানা যায়, মাদকাসক্তি নিরাময় কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত বিশেষজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করে বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে দেশে এক কোটি লোক নেশায় আসক্ত হতে পারে। তারা বলেছেন প্রতিবছর শুধু নেশার পেছনেই খরচ হয় ৬০ হাজারকোটি টাকার বেশি। এমন অবস্থায় পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নেশামুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে ভ’মিকা রাখার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা সবার প্রতি আহবান জানান।

মাদক পরিস্থিতি প্রশাসন ও সরকারের জন্য রীতিমতো চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারকে অসহায় অবস্থায় দেখতে চান না জনগণ। জনগণ মাদক সম্্রাটদের পতন চায়। এই পতনের রোডম্যাপ সরকারকেই তৈরি করতে হবে।

ইতোমধ্যে মাদক নেটওয়াকে কিছু পুলিশ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা যুক্ত হওয়ার অভিযোগও পত্রিকান্তরে পাওয়া যায়। তাই অনুরাগ- বিরাগের বাইরে থেকেই সরকারকে কাজটি করতে হবে।-লেখকঃ চিকিৎসক ও সাংবাদিক

ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে

নবীন চৌধুরী- সময়ের করাল গ্রাসে লোপ পেয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কাঁস-পিতল শিল্প। একসময় কাঁসা-পিতল শিল্পসামগ্রী গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহ্নতসামগ্রী হিসেবে দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার ছোয়াঁয় এসবের ব্যবহারে ভাটা পড়েছে।

ঢাকা জেলার বৃহওম থানা ধামরাই কাঁসা-পিতল শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। শুধু বাংলাদেশে নয়, দেশের বাইরেও এসবের প্রচুর চাহিদা ছিল ।

এছাড়া বিদেশি পর্যটকরা এক সময় কাঁসাপিতলের কারুকাজখচিত জিনিস পত্র নিয়ে যেতেন কিন্তু আজ এই কাঁসা- পিতল শিল্পের ঐতিহ্য নানা সমস্যার কারণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা আজ অভাব–অনটনের দিন কাটাচ্ছেন । পেশা ছেড়ে চলে গেছেন অনেকেই ।

পৈতৃক পেশা ছেড়ে আজ কাঁসা- পিতল শিল্পে জড়িত শিল্পীরা ভিন্ন পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছে । এই শিল্পী ও ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কখনোই কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ধামরাই থানার শত শত কাঁসা –পিতল ব্যবসায়ী ও শিল্পী পরিবার-ছিল। এ শিল্পের লোকদের নিয়ে কখনো কেউ ভাবে না, কখনো তাদের অভিযোগ কেউ শুনতে চায় না ।

এক সময় তাদের এই কাঁসা –পিতল শিল্প খুবই বিখ্যাত ছিল । তারা বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম নকশা করে বিদেশে রফতানি হতো । তাদের তৈরী থালা, কলসি,বাটি, ঘটি ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র সহ অন্যান্য জিনিসের চাহিদা ,এখন অনেকাংশে কমে গেছে। এসব তৈরি জিনিসের দাম বৃদ্ধির কারণ হলো প্রয়োজনীয় উপকরনের অভাব । বেশিভাগ ক্ষেত্রে শিল্প- ব্যবসয়ীরা ধীরে ধীরে এই পেশার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।

ধামরাইয়ের কাঁসা- পিতলে জড়িত বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রকাশ বনিক জানান, তাদের তৈরি জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি খুব একটা । কিন্তু আমদানিকৃত বিভিন্ন উপকররনর দাম বেড়েছে গত ১৪/১৫বছরে প্রায় তিনগুণ।

অপরদিকে ভারতীয় স্টিলের থালা বাটি , চামচ, কাটাচামচসহ বিভিন্ন জিনিসের আধিক্যের কারণে দেশীয় কাঁসা-পিতল শিল্পের জিনিসের চাহিদা যথেস্ট কমে গেছে। এসব কারণে এর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও শিল্পীরা পড়েছেন মহাফাঁপরে। তারা না পারছেন পেশায় টিকে থাকতে, না পারছেন সচ্ছলভাবে সংসার চালাতে।

যারা এই পেশায় আছেন তারা কোনোরকমে টিকে রয়েছেন পেশায়। এক সময় ধামরাই ও সাভার থানার কাঁসা –পিতল শিল্পের সঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার শিল্পী ওব্যবাসায়ী জড়িত ছিলেন। বর্তমানে পুরো থানায় কয়েকজনকে খুজেঁ পাওয়া যাবে ।

আগামী আট-দশ বছর পর আর এদেরকে খুজেঁ পাওয়া যাবে না । আগে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কাঁসা- পিতল শিল্পী ও ব্যবসায়ীদের বসবাস ছিল। সে সময়ে কাঁসা- পিতল পরীক্ষা–নিরীক্ষার টুনটান শব্দ বেজে উঠত। কিন্তু এখন সেই শব্দ যেন মিশে গেছে মহাকালের গতিপ্রবাহের সঙ্গে।

কাঁসা পিতল নকশা কাজে জড়িত একজন শিল্পী অরুণ বণিকের কাছে জানা যায়, একটি কাঁসা পিতল থালা বানাতে সময় লাগে চার ঘন্টা। এতে নকশা করতে সময় লাগে ৩/৪ ঘন্টা । থালা সর্বাসাকুল্যে খরচ দাড়াঁয় ১৫০০/১০০০টাকা । ১০০/১৫০ টাকা লাভ পেলেই তারা বিক্রি করে দেন । এতে দেখা যায়, দিনে একজন নকশা শিল্পীর সর্বোচ্চ ১০০/২০০ টাকা আয় হয়্ । ধামরাইয়ের কাঁসা- পিতল সামগ্রীর বিশিষ্ট একজন ব্যবসায়ী বাবুল আক্তার চৌধুরী ।

ধামরাইতে তার মেটাল হ্যান্ডিক্র্যফটস নামে একটি দোকান আছে । বাবুল আক্তার মোশাররফ হোসেনের কারখানা থেকে কাঁসা–পিতলের জিনিস তৈরি করিয়ে বিভিন্ন ন্থানে বিক্রি করেন। তার দোকানে রয়েছে চোখ ধাঁধানো কারুকার্যখচিত কাঁসা-পিতলের সামগ্রী , যা সবাইকে আর্কষন করে ।

মোশাররফ হোসেন কারখানার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন, রাশিদা মোশাররফ । তিনি কয়েকটি দেশে কাঁসা- পিতল সামগ্রী প্রর্দশন করেন। বাবুল আক্তার জানান, সরকারের উচিত কাঁসা- পিতল সামগ্রী রফতানি এবং বিভিন্ন সময় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ব্যবস্থা করা।

ধামরাইয়ের কাঁসা-পিতল সামগ্রীর চাহিদা আছে ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় । এমনকি অনেক দেশের রাষ্ট্রদুত ধামরাইয়ে এসে কাঁসা- পিতলের সামগ্রী নিয়ে যান। এসবের মধ্যে থাকে বিভিন্ন ধরনের মুর্তি, খাট, স্মৃতিসৌধ,বিভিন্ন শিল্পকর্মের ছবি, জীবজন্তুর ছবিসহ বিভিন্ন জিনিস ।

এসব তৈরি হয় মোশাররফ হোসেন কারখানায় । এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদুত ড্যান মজিনা সহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রদুত এসেছে প্রতিনিধি দল ধামরাই ঐতিহ্যবাহী কাসাঁ-পিতল শিল্প সামগ্রী সুকান্ত বনিকের দোকানে এবং কাসাঁ পিতলের জিনিস কিনে নিয়ে যায়। এছাড়া তারা কাসাঁ-পিতল শিল্পকে কারুকাজ দেখে প্রশংসা করেন।

এছাড়া সুকান্ত বনিকের কাসাঁ পিতলের দোকানে এ পর্যন্ত বিভিন্ন্ দেশের রাষ্ট্রদুতরা এসেছে এবং কাসাঁ পিতলের জিনিস কিনে নিয়ে গেছে।

কাঁসা- পিতল শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কোনো ঋণ পান না। যদি সরকারএবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহযোগিতায় এগিয়ে আসত তাহলে কাঁসা–পিতল সামাগ্রী বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হতো।

ধামরাইয়ের কাসাঁ-পিতল বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সুকান্ত বণিক বলেন, একটি কথা বলতেই হয় দেশের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে বাচাঁতে হলে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে এবং সহজ শর্তে করতে হবে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা।

এবার বর্জন নয়, নির্বাচন

বাংলাদেশে নির্বাচন বর্জন ও নির্বাচনে অর্জন এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দূর অতীতের কথা না বললেও গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘটনা-দূর্ঘটনা ও দূরবস্থার কথা সবার স্মরণে রয়েছে।

গত ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সনে প্রায় ৩ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও তাদের সঙ্গীরা বাদে বিএনপি-জামাত ও তাদের সঙ্গীরা ৫ জানুয়ারি ২০১৪ এ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু বর্জন করেছে বললে অসম্পন্ন বলা হবে। দেশে উক্ত নির্বাচন যাতে না হয় তার জন্য তারা কী অপচেষ্টায় না করেছেন! জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন এটাই স্বাভাবিক।

নির্বাচন সুষ্ঠু, সবার অংশগ্রহণ ও স্বতস্ফুর্ত হওয়ার কথা। দলগত বা ব্যক্তি বিশেষে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বা ভোট প্রদান করা বা না করার অধিকার সকল জনগণের রয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সনের নির্বাচন শুধু বয়কট নয়, বরং নির্বাচনকে দেশে-বিদেশে কালিমাময় ও সর্বসাধারণকে ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য এমন কোন অস্ত্র নাই যা বিএনপি-জামাত জোট প্রয়োগ করেননি। দিনের পর দিন এমনকি মাসের পর মাস তারা ক্ষমতাসীন সরকারকে ধর্মঘট, হরতাল শুধু নয়, জনমানুষের মৌলিক অধিকার সমূহে হস্তক্ষেপ করেছেন। রাস্তা বন্ধ, আতঙ্ক সৃষ্টি, গাড়ী ভাঙ্গা, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও গাড়ী সমূহে অগ্নিসংযোগ করাসহ রাস্তা সমূহ ও রাস্তার পাশ্ববর্তী গাছাপালাসমূহ কেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। শুধু তাই নয়, নির্বাচন পূর্ব ও নির্বাচনকালীন সময় ব্যালট পেপার সমূহ ছিনতাই, পুড়ে ফেলা, কেন্দ্র সমূহে মরনাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা, আতঙ্ক সৃষ্টি শুধু নয়, নির্বাচনী কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যাও করেছন। ফলে বিতর্কিত এক নির্বাচন স্বল্প সংখ্যক ভোটারের ভোট দেয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে পড়েন।

অপরদিকে হেফাজত-এ-ইসলামি নামক বিশাল ধর্মান্ধগোষ্ঠীর বিরোধীতায় আওয়ামী লীগ ও বামভাবাপন্ন রাজনৈতিক দল আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তাদের অভিযান চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অনেক ধ্বংসলীলা ও আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটাতে হয়। যাই হোক এবার সেই পরিস্থিতি নাই। মূলত হেফাজত-এ-ইসলামের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে কওমী মাদরাসার শিক্ষায় ‘‘দাওরায় হাদিসের’’ স্বীকৃতি অর্থাৎ মাস্টার্স পর্যায়ের সমতুল্য ডিগ্রী প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ ও ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটাতে পেরেছেন শেখ হাসিনার সরকার। শুধু তাই নয় তারা এ বিষয়ে শুকরানা আদায়, প্রকান্তরে রাজনৈতিক না হোক মানসিক প্রশান্তি প্রকাশ করেছেন। এক বাক্যে বলা যায়, ২০১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বড় রকমের বাধা সৃষ্টির উপযোগী ব্যবস্থাসমূহ একরূপ সুপ্ত বা অনুপস্থিত। উপরন্ত বিএনপি’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী জামাতে ইসলামী নামে দলের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। যদিও তারা অভ্যন্তরীনভাবে এখনও সংগঠিত।

এবার নির্বাচন পূর্ব সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো দুইটি বৃহৎ ও পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়া, বিশেষ করে বিএনপি’র পক্ষ থেকে কয়েকবছর ধরে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে সংলাপ -সংযোগের কথা বলা হচ্ছিল। অপরদিকে জামাত ও বিএনপিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হত্যা ও খুনের অভিযোগে সংলাপ প্রত্যাখান করা হয়েছিল। বিএনপি গত নির্বাচন বিমুখতা তাদের বিশাল কর্মীবাহিনীকে জনগণ থেকে একরূপ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। যদিও বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচন সমূহে অংশগ্রহণ করে বেশ সফলতাও পেয়েছে।

বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা মনে করে তারা এক ধাক্কায় ক্ষমতার অধিকারী হবে। ক্ষমতার বাহিরে তাদের থাকা মানায় না। উপরন্ত আওয়ামী লীগ মূলত দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তাই যে করেই হোক তারা আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাধ গ্রহণ করবে। দেশ ও জাতির জন্য কে কার চেয়ে ভালো, যোগ্য এবং দেশ পরিচালনা ও উন্নয়ন করবে তার চেয়ে কে বিরোধী পক্ষকে নিশ্চি‎হ্ন ও নিগ্রহ করবে সেই প্রতিযোগিতা দেখা যায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ ছিল বঞ্চিত জনগণের প্রত্যাশা পূরণ। যা রাষ্ট্রের মূল নীতিতে উল্লেখ রয়েছে তা বাস্তবায়িত হবে। যাই হোক বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বলা যায়, বিতর্কিত নেতৃত্বের হাত থেকে খানিকটা দূরে অবস্থান করে ড. কামাল হোসেন ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তুলেছেন। যদিও তিনি জোটের হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পত্র লিখেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তড়িৎ উত্তর প্রদান করে সংলাপের ব্যবস্থা করেছেন।

সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে ৭ দফা দাবী না মানার কথা বলা হচ্ছে এবং আইনগত কিছু বাধ্যবাধকতা ব্যতিত অধিকাংশ দাবী মানা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তবে আমরা যা দেখছি, দেশে নির্বাচনী একটা পরিবেশ ফিরে এসেছে। দুই পক্ষই মনোনয়ন ও ভোটের প্রতিযোগিতার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। যতদূর লক্ষ করা যায়, পুরাতন বা গায়েবী মামলা মোকদ্দমা নিয়ে বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের হয়রানী করা হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব অনেক বৃদ্ধি পাওয়ার কথা এবং সাংবিধানিক ভাবে তা আরও জোরদার করার ব্যবস্থা করা উচিত বলে প্রতীয়মান হয়।

নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনকালীন সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে বটে। তবে চলমান সরকারের প্রশাসন-পুলিশ ও অন্যান্য বিভাগের প্রতি প্রয়োজনে চড়াও হওয়া বেশ কঠিন বলে প্রতীয়মান হয়। যদি সংসদ বহাল না থাকত বা সরকার অল্প কয়েক ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গঠিত হতো বা রাষ্ট্রপতিকে সার্বিক দায়িত্ব প্রদান করা হতো তাহলে সমতল মাঠ নিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থায় হয়তো কথা উঠতো না।

ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করা হয়েছে। সামরিক শাসনের যাতাকল থেকে বেরিয়ে আসতেও জাতিকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়েও তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি। তবে পশ্চিমা বিমুখতা বাঙ্গালিদের পেয়ে বসে। ১৯৬৯ এর গণঅভুত্থান এবং ১৯৭০ এর নির্বাচন বাঙ্গালীদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেয়। ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশে সামরিক শাসন পূনরায় ভর করে। ১৯৯০ এ সামরিক শাসনকে সম্মিলিতভাবে ‘না’ বলা সম্ভব হয়। তবুও মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর দলাদলি, নেত্রীবৃন্দের অযোগ্যতা, হিংসা, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির দখলদারিত্ব, অবৈধভাবে অর্থলিপ্সা গণতান্ত্রিক ও সুশাসনের জন্য প্রতিষ্ঠানসমূহে হস্তক্ষেপ ইত্যাদি সুচিন্তিত ও সাধারণ জনগণকে পীড়া দেয়।

বাংলাদেশের কোন সরকার সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মনিয়োগ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয় না। বিএনপির শাসনের সময়ে দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটে, তাদের মদদ দেওয়া হয় জাতির জনকের হত্যাচারীদের পদোন্নতি ও বিশেষ সুবিধা ও ইনডেমনিটি আইন তৈরি করা হয়। যদিও বিএনপি অমূলক দাবী করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে একথা স্বীকার করতে হবে যে বিএনপি একটি বিপুল সমর্থিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

এদিকে আওয়ামী লীগের গত ১০ বছরের শাসনে অনেক দৃশ্যমান অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। আবার সুশাসনের ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধাচারনে কিছু দোষে দোষী বলা যায়। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণভাবে বিশেষ করে নিম্ন আদালতকে উচ্চ আদালতের আয়ত্ত্ব থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির (এস. কে সিনহা) বিরুদ্ধে অযাচিত অভিযোগ আনয়ন করা হয়। এমনকি দেশের অনেক গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে তুচ্ছ জ্ঞান করে গালমন্দ করা হয়। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসের বিরুদ্ধাচারণ এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

শুধু ক্ষমতার মসনদ বা রাজনৈতিক দখলদারিত্বের জন্য দেশ ও জাতি নয়। এই উপলব্ধি থেকে সম্মিলিত ভাবে দেশ পরিচালনার হওয়ার কথা। শুধু নির্বাচন গণতন্ত্র নয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রান্তিক জনগণকে ক্ষমতায়ন করতে হবে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সুষ্ঠু জাতি গঠনের জন্য জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনসমূহ যথেষ্ঠ অর্থবহ। সুস্থ্য, স্বাভাবিক, নির্ভেজাল নির্বাচন একটি জাতির উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কারচুপি বা রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন পীড়নের মাধ্যমে তথাকতিথত নির্বাচনে মিছামিছি জনপ্রতিনিধি হওয়ার মাধ্যমে কোন তৃপ্তি বা শান্তি-স্বস্থি নেই।

পাশাপাশি সরকার বিরোধী বা রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত দল বা গোষ্ঠীকে বুঝতে হবে। রাতারাতি বা অতি শীঘ্রই পট বদলানো যাবে না। বদলাতে হবে গণমানুষের মানসিকতা এবং সেজন্য তাদের নৈকট্য লাভ করতে হবে, বিশ্বস্ত হতে হবে। তৃতীয় শক্তির উপর ভর করে নয় বা দেশকে দুর্বিপাকে ফেলে বাধ্য করে নয়। যেন জনপ্রতিনিধির যোগ্যতা অর্জন করে জয়ী হওয়া যায়, সরকার গঠন করা যায়। এজন্য জাতীয় সংসদে যোগ্যতর সরকারী ও বিরোধী দলের প্রতিনিধি সংখ্যায় যত কম বা বেশি হোক অতি প্রয়োজনীয়। ৭ মার্চ’৭১ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের একটি বাক্য মনে রাখার মতো। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে যখন ঢাকায় প্রথম জাতীয় সংসদ অধিবেশন বসার কথা, বঙ্গবন্ধু পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিনিধিদের অভয় দিয়ে বলেছেন। আপনাদের সংখ্যালঘু সদস্যদের শুধু নয়, একজনও যদি ন্যায্য কথা বা দাবী তোলেন আমরা তা মেনে নিব।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বর্তমান প্রশাসন ও পুলিশকে রাজনৈতিক দল বা সরকারের আজ্ঞাবহ করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনীকে হয়ত ভূতে পেয়েছে। ছোটবেলায় একটি বাক্য গ্রামে গঞ্জে খুব প্রচলিত হতে শুনেছি, যে কোন অকারণ বা উটকো ঘটনা ঘটলে মুরব্বীরা ছোটদের বলতেন, ভূতের হাতে খন্তি (শাবল) তুলে দিলে এমন ই হয়। বর্তমান সরকার মনে হয়, পুলিশের হাতে খুন্তি তুলে দিয়েছেন। তাই তারা যা ইচ্ছা করছেন। এই খুন্তি কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা না করলে ভূতুড়ে কাণ্ড বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। পুলিশি রাষ্ট্র নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সুশাসনের জন্য এর বিকল্প নাই। গণতন্ত্র ও সুশাসন ধীরে ধীরে হলেও প্রতিষ্ঠা লাভে অগ্রগতি হোক, এটাই দেশবাসীর আশা।

যাই হোক ২০০৮ এর নির্বাচন এর অনুকরণ এবার নয়। দুই পক্ষ এবার নির্বাচনমুখী দেশ ও জাতির কল্যাণে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক রূপে চি‎িহ্নত হোক ২০১৮ এর নির্বাচন এই প্রত্যশা ও অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী।-

ডাঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

আজীবন সদস্য

প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, দিনাজপুর।

সভাপতি, শহীদ আসাদুল্লাহ স্মৃতি সংসদ

এবং মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ স্মৃতি সংগ্রহ কমিটি।

মোবাঃ ০১৭৭৩২৩৮২৫২

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে রেডিও

সুমন কুমার বর্মণ, গাইবান্ধা- এক সময় দেশ-বিদেশের খবরা-খবর জানার একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও। তখন খবরের সময়ে শহর কিংবা গ্রামের লোকজন একটা নির্দিষ্ট স্থানে খবর শোনার জন্য সমবেত হত। কারণ তখনো সবাব ঘরে ঘরে রেডিও’র প্রচলন ছিলনা। ফলে অনেকেই বিয়েতে উপকৌটন হিসেবে রেডিও (বেতার) গ্রহণ করত।

এরপর অবশ্য রেডিও’র প্রচলন বৃদ্ধি পেয়ে সবাব ঘরে ঘরে জায়গা করে নিয়েছিল। এর ফলে আর শহর কিংবা গ্রামের মানুষকে দল বেঁধে জড়ো হয়ে খবর শুনতে হতো না। কারণ প্রত্যেকেই তখন নিজ নিজ রেডিও টুইনিং করে খবর শুনতেন।

সে সময়ে তরুন সমাজের কাছে রেডিও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তারা রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত, ছায়া ছবির গান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, নাটক শোনায় অভ্যস্থ হওয়ায় রেডিও’র প্রচলন ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে সেই জনপ্রিয়তা তরুন প্রজন্ম বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি।

সময়ের বিবর্তনে তারা রেডিও ছেড়ে টেপ রেকডার (ক্যাসেট) এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। পরবর্তীতে সেটিরও বিলুপ্তি ঘটিয়ে মোবাইল তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

বর্তমানে মোবাইলের কারনে রেডিও’র অনুষ্ঠান জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে। এখন আর তরুন-তরুনিরা আগের মত রেডিও শোনেন না। তবে এখনো কিছু বয়োজষ্ঠ ব্যক্তি আছেন যারা রেডিও বিবিসি’র খবরের উপর নির্ভশীল।

তাদেরই একজন আবুল কালাম আজাদ প্রতিবেদককে জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার থেকে সরাসরি সম্প্রচার কৃত খবর শোনার একমাত্র মাধ্যমেই ছিল রেডিও। যে খবর শোনে লক্ষ বাঙ্গালি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে উজ্জ্বিবিত হয়েছিল।

তৎকালিন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক আঠারো মিনিটের ভাষণ সরাসরি রেডিওতে শুনে লাখো বাঙ্গালি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ  করেছিল।

গাইবান্ধা কমিউনিটি রেডিও সারাবেলার নিয়মিত শ্রোতা মো. রুবেল মিয়া  জানান, বর্তমানে বিজ্ঞানের আবিষ্কারে ফলে অতি সহজেই মোবাইল এফ.এম-এর মাধ্যমে আমরা রেডিও অনুষ্ঠান গুলো শুনতে পাই। ফলে নতুন করে আর রেডিও (বেতার যন্ত্র) ক্রয় করে খবর শোনার প্রয়োজন পড়েনা। ফলে দিন দিন আমাদের সেই ঐতিহ্যবাহী রেডিও (বেতার যন্ত্র), যার বৈজ্ঞানিক নাম টেনডেষ্টার হারিয়ে যেতে বসেছে।
নূর মোহাম্মদ খালেক একটু অন্যভাবে প্রতিবেদককে জানান, রেডিও’র গুরুত্ব এখনো কমে যায়নি। যাদের কাছে এটির গুরুত্ব থাকা পয়োজন তাদের কাছে এখনো এর যথাযথ গুরুত্ব রয়েছে।

আমাদের ভুলেগেলে চলবে না, এই স্বাধীন বাংলার প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা রেডিও’র মাধ্যমেই শুনেছি। তাই আসুন আমরা  সবাই  আমাদের হারিয়ে যাওয়া এই রেডিওটির গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনি। তাই এই বেতার যন্ত্রটিকে টিকেয়ে রাখাতে এখনেই প্রয়োজন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যুগোপোগী অনুষ্ঠান নির্মাণ করা।

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য গরুর গাড়ী

বিল্লাল হোসেন: আবহমান গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য একমাত্র পরিবহন গরুর গাড়ী সময়ের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

“ও কি গাড়িয়াল ভাই, কত রব আমি পন্তের দিকে চাইয়া” সেই গান এক সময় গাড়িয়ালের সাথে সাথে গ্রাম বাংলার সহজ সরল মানুষ মুখে মুখে গেয়ে ফিরতো সারাক্ষন।

এক সময়ে মানুষের মালা-মাল পরিবহন ও দুরদুরান্তে যাতায়াতের জন্য গরুর গাড়ীই ছিল একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু এখন গরুর গাড়ী চোখে পড়ে না। কালের পরিবর্তনে সেই পরিবেশ বান্ধব পরিবহন আজ বিলুপ্তির দার প্রান্তে চলে এসেছে। বৃহৎ আকৃতির গোলাকার দুটি চাকা বাবলা কাঠের তৈরি করা হয়।

মালামাল বহনের জন্য গাড়ীর উপরে ঝোড়া বা বেড়া লাগানো হয়। আর মানুষ বা নতুন বর কনে বহনের জন্য ব্যবহার করা হয় বাহারি ছাউনি গুলি। যেটাকে গ্রাম বাংলার মানুষ সইয়ে গাড়ী বলে।

কাঠ ও বাঁশের তৈরি গরুর গাড়ীগুলি অধিকাংশ লোক জীবন জীবিকার তাগিদে ভাড়ায় ব্যবহার করা হত। মধ্যবিত্ত ও ধনি শ্রেনীর লোকেরা ঐতিহ্য ও ব্যক্তিত্বের জন্য নিজেরা কর্মচারী রেখে গাড়ী ব্যবহার করতো।

যশোরের বিভিন্ন উপজেলায় এক সময় এই গরুর গাড়ী তৈরি করে অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গরুর গাড়ী তৈরির মিস্ত্রিদের ছিল ব্যস্ততা। দম ফেলার সময় থাকতো না তাদের। আজ যান্ত্রিক যুগের দাপটে সে সব কেবলই স্মৃতি। এখন আর মিস্ত্রি পাড়ায় বাজে না হাতুড়ির শব্দ।

মণিরামপুর উপজেলার হানুয়ার গ্রামের গাড়ওয়ান নুনু বলেন, এ উপজেলায় একসময় হাজার হাজার গরুর গাড়ী ছিল। যারা গরুর গাড়ী চালিয়ে সংসার চালাতো। আজ আর তা চোখে গড়ে না। ইঞ্জিন চালিত গাড়ীঘোড়ার কারনে সব হারিয়ে গেছে।

কৃষিক্ষেত্রে আজও ফুরায়নি লাঙ্গলের ব্যবহার

আশিকুর রহমান টুটুল-বিশ্ব কবির ভাষায় বলতে হয়, ‘চাষী খেতে চলাইছে হাল তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল বহুদূর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার তারি পরে ভর দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার’।

তাই হাল, লাঙ্গল, মই আদিকাল থেকে কৃষি কাজে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত যন্ত্র।

বীজ অথবা চারা রোপণের জন্য জমির চাষের ক্ষেত্রে গরুর হাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে আর ওই মাটিকে সমান করার জন্য প্রয়োজন হয় মই।

কৃষি কাজে ব্যবহৃত অন্যতম এই পুরনো যন্ত্র দিয়ে জমি চাষ উপযোগী করার জন্য ষাঁড়, মহিষের প্রয়োজন হতো। পুরানো লাঙ্গল দিয়ে হালচাষ করতে কমপক্ষে একজন লোক ও একজোড়া গরু অথবা মহিষ প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রেরযুগে যন্ত্রদিয়ে জমি চাষের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বংলার এই ঐতিহ্যবাহি গরুর লাঙ্গল।

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ এই দেশের প্রায় ৮০% লোকের জীবিকা কৃষি কাজের ওপর নির্ভর। তবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লাঙ্গল-জোয়াল, ফাল, দা, কাস্তে, খুনতি, মই, গরু, মহিষ আজ বর্তমান যুগে ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এখনও ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে।

চিরায়ত বাংলার লোকজ যন্ত্রপাতির সন্ধান করতে গেলে কৃষি কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে হালের গরুর লাঙ্গল অন্যতম। লালপুর উপজেলার ওয়ালিয়া মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, গরুর লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষের দৃশ্য।

এ সময় ওয়ালিয়া গ্রামের আবুল হোসেন, রান্টু আলী, রবিউল ইসলাম, আমির হোসেন, আনছার আলীসহ অনেক কৃষকের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, বাংলাদেশের মানচিত্রে সবচেয়ে উষ্ণ ও কম বৃষ্টি পাতের এলাকা হিসেবে পরিচিত এই লালপুর উপজেলা ৬০% মানুষের অন্যতম পেশা কৃষি এক সময় এই অঞ্চল মানুষদের সকাল হতো লাঙ্গল-জোয়াল আর হালের গরুর মুখ দেখে।

আধুনিক যন্ত্র যুগে এখন সেই জনপথের মানুষদের ঘুম ভাঙে হালচাষ যন্ত্র ‘পাওয়াট্রিলার’ এর শব্দে। এইতো কিছু দিন আগের কথা যখন এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গরু লালন-পালন করা হতো। এই গরুগুলো ছিলো পরিবারের এক একটা সদস্যের মতো।

তাজা ঘাস আর ভাতের মাড়-খৈল, ভুসি ইত্যাদি খাইয়ে সবল করে তোলা হতো হালের জোড়া বলদদের, আবার তাদের দিয়ে বিঘার পর বিঘা জমি চষে বেড়াতেন কৃষকরা আর মনের সুখে গান গাইতেন ‘বাড়ির পাশে বেতের আড়া হাল জুড়াইছে ছোট্ট দেওরা রে, এতো বেলা হয় ভাবিজান পান্তা নাই মোড় ক্ষেতে রে’।

গ্রামীণ জনপথে জমিগুলোতে এই ভাবেই চাষাবাদ করা হতো। বর্তমানে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার কৃষি ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য নিয়ে এসেছে স্বীকার করে তারা বলেন, যে কৃষক গরু দিয়ে হাল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতো কালক্রমে তারা পেশা বদল করে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। তবে ক্ষেত্র সমীক্ষায় দেখা যায়, এখনো এই অঞ্চলের অনেক কৃষক জমি চাষের জন্য লাঙ্গল-জোয়াল, গরু আর মই দিয়ে চাষ পদ্ধতি টিকিয়ে রেখেছেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, কাজী গোলাম মাহবুব ও ভাষা-আন্দোলন

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অভিস্মরণীয় দিন। একুশের আন্দোলনে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যদায় প্রতিষ্ঠিত করতে শহীদ হন রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও অহিউলাহ সহ নাম না জানা আরো অসংখ্য ভাষাবীর।

সংগত কারণেই দিনটি আমাদের অস্থিমজ্জার সাথে মিশে আছে আর শহীদদের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে নির্মিত শহীদ মিনার আমাদের অস্তিত্বের প্রহরী হিসেবে অবিনশ্বর হয়ে আছে। ২১ ফেব্রুয়ারি আজ শুধু একটি দিন বা তারিখ নয় স্বকীয় মহিমায় উদ্ভাসিত একটি চেতনা আর ঐতিহ্যের নাম।

ভাষার জন্য রক্ত দানের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে খুবই বিরল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি বাঙালি জাতি বিশ্ব দরবারে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেশাত্মবোধে উজ্জবিত হয়ে নিজের বিলিয়ে দিয়েছিল মাতৃভাষার জন্য। বাঙালির রক্তøাত এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। ৫০ বছর পর হলেও বিশ্বের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে বাঙালির অমর একুশে।

২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অমর একুশে জাতীয়তার গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ২১ ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রথম কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রফিককুল ইসলাম (মূল নাম খানমোহাম্মদ মিজানুর ইসলাম সেলিম) রফিকুল ইসলামসহ দশ জন বাঙালি বিভিন্ন ভাষাভাষীর পরিচয়ে কানাডায় যোগাযোগের ঠিকানা ব্যবহার করে তারা গড়ে তুলেন Mother Language Lover of the World নামের একটি সংগঠন।

১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ তারাই উদ্যোগী হয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে একটি চিঠির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নামে একটি দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করেন।

বাংলাদেশের অমর ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে চিহ্নিত করে তারা চিঠিতে এই দিনের তাৎপর্য তুলে ধরেন। জাতিসংঘ এ চিঠি পাবার পর তাদের জানিয়ে দেয় যে চিঠি দিতে হবে ইউনেস্কোকে।

রফিকুল ইসলাম (ইউএনইএসসিও)-এর অফিসে যোগাযোগ করলে সেখানকার ভাষা বিভাগের আন্না মারিয়া ইতিবাচক উত্তর দেন এবং জানান যে, ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি উত্থাপনের সুযোগ নাই। পরিচালনা পরিষদের কোন সদস্য রাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থাপন করতে হবে। সেই প্রেক্ষিতে রফিকুল ইসলাম ১৯৯৯ সালের ২৩ জুন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠান।

উক্ত পত্রপ্রাপ্তির পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি অতীব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তৎকালনি প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর সক্রিয় আন্তরিক সহযোগিতায় অতিদ্রুত গতিতে সকল আমলাতান্ত্রিক বিধিমালা এড়িয়ে তারা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।

১৯৯৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর Bangladesh National Commission for UNESCO সংক্ষেপে UNCU এর পক্ষে সচিব প্রফেসর কফিল উদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরে ১৭ লাইনের একটি ঐতিহাসিক প্রাস্তাব প্যারিসে পাঠানো হয়।

UNCU-র নির্বাহী পরিষদের ১৫৭ তম অধিবেশন ও ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে সকল সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিতে ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

২০০০ সাল থেকে বিশ্বের সর্বত্র ১মে, মে দিবসের মত ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। এভাবেই বীর বাঙালির গৌরবদীপ্ত রক্তাত ভাষা-আন্দোলন শহীদ দিবস ও শহীদ মিনার বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও স্বীকৃতি অর্জন করলো। বাঙালির প্রাণস্পন্দন অমর একুশ সারা বিশ্ব স্বীকৃতি পেল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন এদেশের আরেক কৃতি সন্তান, বাহান্নর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এ্যাডভোকেট কাজী গোলাম মাহবুব (ছরু)।

তিনি ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক ‘ঐতিহ্য’ নামক একটি পত্রিকার ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন“ আমি সেদিন (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) অবাক হয়েছিলাম একটি রক্তপাত কীভাবে একটি মহৎ এবং বিশাল আন্দোলনের জন্ম দিতেপারে।

এ তো রক্তপাত নয় এ হলো চেতনার উন্মেষ সংগ্রামের সলতের দাহিকা শক্তির আগুন জ্বালানো। সেদিন মনে হয়েছিল আমেরিকার মে দিবসের মতোই এ দিনটিও নিশ্চিয়ই আমাদের জাতীয় ইতিহাসে স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হবে। উক্ত সাক্ষাৎকারটি ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ঐতিহ্য পত্রিকায় ‘ভাষা-আন্দোলন প্রসঙ্গ কথা’ নামে প্রবন্ধাকারে পুনঃমুদ্রিত হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ডকুমেন্টশন পুস্তিকায় বিশিষ্ট গবেষক ড. মোহাম্মদ হান্নান বলেছিলেন, তবে “সরাসরি একুশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি সর্বপ্রথম উত্থাপিত হয় বাংলাদেশের গফরগাঁও থেকে।

১৯৯৭ সালের একুশের এক অনুষ্ঠানে গফরগাঁও থিয়েটার নামক সংগঠন একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্টার দাবি তুলেছিলেন।

১৯৯৯ সালের একুশের সংকলনে গফরগাঁও থিয়েটার তাদের দাবি পূনর্ব্যৃক্ত করে। অর্ঘ্য নামেই এই সংকলনে এ বিষয়ে নিবন্ধ প্রকাশ ছাড়াও প্রচ্ছদে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস চাই, একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই শীর্ষক শোগানও তারা মুদ্রিত করে। তিনি আরো বলেন ৩০ নভেম্বর (১৯৯৯) তারিখ বাংলাদেশ অবজারভার চুয়াডাঙ্গা থেকে পাঠানো পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী এনামুল হকের একটি চিঠি প্রকাশ করে।

চিঠিতে এনামুল হক দাবি করেন ১৯৯৮ সালের ২৫ মার্চ তিনি জাতিসংঘের মহানচিব কফি আনানের কাছে একুশে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দানের আহ্বন জানিয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন।

উক্ত আলোচনায় যেসব উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে তার সবগুলোই ১৯৯৪ সালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কাজেই এ যাবৎকালে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পুস্তক-পুস্তিকা থেকে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে ১৯৮৬ সালে কাজী গোলাম মাহবুবই সর্বপ্রথম ২১ ফেব্র“য়ারি মহান মে দিবসের সাথে তুলনা করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

কাজী গোলাম মাহবুব ২১ ফেব্রুয়ারিকে কেন মে দিবসের সাথে তুলনা করেছিলেন তার সারা জীবনের সাধনা ও স্বপ্নের মধ্যে ২১ ফেব্র“য়ারি এক উজ্জল নক্ষত্র। ২১ ফেব্র“য়ারিকে তিনি দেখেন অনেক বড় করে কারণ অমর একুশে তার জীবনের অচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তার সমস্ত সত্তার সাথে মিশে আছে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষী তিনি। সেদিন মেডিকেল কলেজে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর পুলিশের গুলিবর্ষণসহ সকল ঘটনা তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কাজী গোলাম মাহবুবই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি ২১ ফেব্রুয়ারিকে আমেরিকার মে দিবসের সাথে তুলনা করে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এই দিনটি স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তার এই উক্তির ১৪ বছর পর ২১ ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা তার জীবন ও মনে কতটুকু রেখাপাত করেছে এই সাক্ষাৎকারটি এর জলন্ত প্রমাণ।

‘ঐতিহ্য’ নামক প্রত্রিকাটি কাজী গোলাম মাহবুবকে মোট ১০টি প্রশ্ন করেছিল। সর্বশেষ প্রশ্নটি ছিল সম্ভব হলে, ভাষা-আন্দোলনের সময়কার এমন কোন ঘটনা উলেখ করুন, যা আপনার মনে বিশেষভাবে রেখাপাত করেছিল? তিনি উত্তরে প্রথমে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারির ঘটনা বর্ননা করেন এবং সর্বশেষ ৫ টি চরণের মধ্যেই এই মহান উক্তিটি করেছিলেন।

উক্তি সাক্ষাৎকারের এই ৫টি বাক্যের প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। অত্যন্ত সুন্দর শব্দ চয়নে সমৃদ্ধ এই বাক্যগুচ্ছগুলো ২১ ফেব্র“য়ারি সম্পর্কে উচ্চারিত সকল কথা মালার মধ্যে সর্বোত্তম কথা বা উক্তি বলে বিবেচিত হতে বাধ্য, কারণ তার এই উক্তির মধ্যেই সুস্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছিল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কথা। ইতিহাস এই অবিস্মরণয়ি উক্তি যথার্যভাবে মূল্যায়ন করবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদর্যাপন জাতীয় কমিটি ২০০০ সালে কাজী গোলাম মাহবুবকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান করেন। সম্মাননা প্রদানকালে তারা বলেছিলেন, মাতৃভাষার জন্য আপনার অসামান্য ত্যাগ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্ব আজ গৌরবময় ইতিহাস।

বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা ছাড়াও পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে সম্মান জানিয়েছে আপনাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের প্রতি।

বাংলা ভাষার এ আন্তর্জাতিক সম্মান ও স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে সমগ্র জাতি শ্রদ্ধাভরে কৃতজ্ঞতারতরে স্মরণ করছে আপনার সাহসী ও গৌরবদীপ্ত অবদান। লেখক-, এসএম ওমর আলী সানি, সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন একটি নিপুণ শিল্প শৈলী মাধ্যম বাংলাদেশ

শিল্প-সুন্দর মন ও জীবনের জন্যই সৃষ্টি, সৌন্দর্য্যের শৈল্পিক ব্যবহার যুগ যুগ ধরেই আবহমান বাংলায় মানব জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। শিল্পের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। আসলে জোর দিয়ে বলতেই হচ্ছে বিজ্ঞাপন শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প মাধ্যম।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সৃষ্টির সাহিত্যতত্ত্বে সৌন্দর্য সম্পর্কে আলোকপাত করতেই বলেছে, সুন্দরের হাতে বিধাতার পাসপোর্ট আছে, সর্বত্রই তার প্রবেশ সহজ। অর্থাৎ সুন্দর সব কিছুতে খুব সহজে, সর্বত্রই প্রবেশাধিকার পায় মানুষ।
তাই সুন্দরের প্রতি আকর্ষণবোধ হওয়া মানুষের চিরন্তনী স্বভাব।

বিধাতার পাসপোর্টধারী এসুন্দর শিল্পকলার মধ্যে বিজ্ঞাপন শিল্প অস্তিত্ব ত্বরান্বিত হওয়ার জন্যই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, খেলা ধুলা, বিনোদন এবং মানবাধিকার ইত্যাদি কর্মকান্ড জড়িত। বিজ্ঞাপন একটি নিপুণ শিল্প শৈলী মাধ্যম। সাধারণ অর্থে বলা যায়, পন্যদ্রব্যের পরিচিতি এবং বেচাকেনার জন্যই খরিদ্দারদের আকর্ষণ করার ব্যবসায়িক কৌশল বা আর্ট।

ব্যবসা বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই বিজ্ঞাপন শিল্পের গুঁড়া পত্তন হয়েছে।পণ্যদ্রব্য সম্পর্কে ক্রেতাদের মধ্যে জানাজানি এবং তা ক্রয়ের জন্য এক ধরনের প্রভাবিত করার লক্ষে ভাড়া করা জায়গায় চাপানো অথবা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে সংবাদ চাপানোর নাম বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন শিল্পকে বলা চলে বাণিজ্যের প্রসাধন।

মেয়ে যেমন প্রসাধন দিয়ে নিজকে আকর্ষণীয় করে তুলে, ঠিক তেমনই বিজ্ঞাপন পন্যকে শিল্প সম্মত ভাবেই প্রকাশ করে ক্রেতাদের কেনার আগ্রহ বাড়ানোর এক সেতু বন্ধনের অনবদ্য শিল্প কৌশল।
সংবাদ পত্রে দেখা যায় অজস্র প্রকারের বিজ্ঞাপন, আবার রেডিও শুনতে যাওয়া হোক না, সেখানেও

শ্রবণইন্দ্রিয়কে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে বিজ্ঞাপন। টেলিভিশনের সামনে বসুন না, সেখানেও চোখ-কান দুটোকে আকৃষ্ট করছে বিজ্ঞাপন। সিনেমা দেখতেও বাড়তি আকর্ষণ পাওয়া যায় বিজ্ঞাপনের।

পথচারী পথ চলতে গেলেও পেয়ে থাকে বিজ্ঞাপনের অনেক দৃষ্টি নন্দন আবহ। লঞ্চ, স্টীমার, রেল গাড়ি, বাস বা বিমান যাতেই চলাফেরা করা হোক না কেন, দেশীয় বিজ্ঞাপনের সঙ্গে পরিচয় ঘটবেই। হাট-বাজারে, গঞ্জে ও শহরে ক্যানভাসাররা ছায়ায় মতো অনুসরণ করবেই বিজ্ঞাপনের পসরা সাজিয়ে।

সেলসম্যানেরা দোকানে বিজ্ঞাপন চাপিয়ে দিতে তারা যেন, প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যান এবং তারা বলেও থাকে অন্য ঔষধের চেয়ে তার কম্পানির ঔষধটাই শ্রেষ্ঠ ঔষধ। এক সময় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের গঞ্জে এবং হাটে বাজারে মুড়ির টিন বা তেলের টিনে শব্দ সৃষ্টি করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মজার মজার বিষয় ভিত্তিক বিজ্ঞাপন বা বার্তা প্রচার করেছিল।

এখন এই প্রযুক্তির বিজ্ঞাপন বিলুপ্তির পথে হলেও তাকে বিজ্ঞাপনের আওতাতেই গন্য করা হয়। সকল দিক বিবেচনা করে বলা যায় বর্তমান যুগ যেন গুরুত্বপূর্ণ এক বিজ্ঞাপনের যুগ।

বিজ্ঞাপন শিল্প সর্ব প্রথম কোথায় বা কবে থেকেই শুরু তার সঠিক ইতিহাস এখনও জানা না গেলেও ধারনা মাফিক বলা যায়, অতি প্রাচীন কাল থেকেই বিজ্ঞাপন শিল্প বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভাবেই ব্যবহার হয়। ছাপারযন্ত্র আবিষ্কারের আগে প্রধানত মুখে মুখে প্রচার করেই বিজ্ঞাপন শিল্পের এমন বৃহৎ কাজটি সম্পাদন করেছিল।

সুতরাং বলাই যায় যে, পঞ্চাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা চালু ছিল। ১১৪১সালে ফ্রান্সের বৈরী শহরে খুব চিৎকার করে উৎপাদিত পন্যদ্রবের কথা ঘোষণা করেছিল। ঐ সময় ১২ জন লোকের একটি দল বৈরী শহরে উৎপাদিত পণ্যের জন্য একটি বিজ্ঞাপন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল।

কোম্পানি এসংস্হাকে ফ্রান্সের আষ্টম লুই স্বীকৃতি দিয়েছিল বৈকি। সম্ভবতঃ এটিই হবে পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রাপ্ত বিজ্ঞাপন সংস্থা। সুতরাং এই উপ-মহাদেশের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় সর্বপ্রথম বিজ্ঞাপন শুরু, বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমেই। কিন্তু বিগত শতাব্দীতে এ দেশে বিজ্ঞাপন হয়েছিল ঢোল পিটিয়ে এবং কন্ঠ ধ্বনির চিৎকার ঘটিয়ে।

অনেক পন্ডিত ব্যক্তিবর্গদের মতে, বিজ্ঞাপন পোস্টার শুরু প্রচীন গ্রীস ও রোমে। গ্রীস এবং রোমান ব্যবসায়ীরা দোকানে সাইন বোর্ড ছাড়াও কাঠের ফলকে অথবা দেয়ালে প্রচারকেরা বৌদ্ধ জীবন যাত্রার নানা ঘটনা চিত্রায়িত করে সেই গুলিকে মুখের কথার দ্বারাই এক জায়গা থেকে অন্যান্য জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রচার করেছিল।

১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে এসে আরও অনেক আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে ছাপার নানান কায়দা আবিষ্কার করে তারা, ছাপাকে বিভিন্নভাবে বিজ্ঞাপন করে ও পণ্যেদ্রব্যের প্রচারের কাজে লাগাতে শুরু করে। আবার বিলেতে ছাপাখানার প্রবর্তন হয়েছিল উইলিয়াম ক্যাক্সটনের মাধ্যমে ১৪৭৭খ্রিস্টাব্দে, শুধুমাত্র অক্ষ বিন্যাসেই তা ছাপা বিজ্ঞাপন হয়ে উঠে। তাকে দোকানে দোকানে লটকিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিল। অবশ্য এই বিজ্ঞাপনটি ছিল হ্যান্ড বিলের আকারেই যেন ছাপানো।

পরবর্তীতে পুস্তক-পুস্তিকা, সাময়িকী এবং সংবাদ পত্র ইত্যাদির প্রসার ঘটার সঙ্গে অথবা যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন দিক জোরালো হয়। সেই সময়ে বিভিন্ন কারণেই বিজ্ঞাপন ব্যবহার হতো।

তবে তখন সবচেয়ে বেশিরভাগ বিজ্ঞাপন ছিল উৎপাদিত মালা মাল সম্বন্ধে জনসাধারণেরকে অবহিত করা। পরে আবার লিথোগ্রাফির ব্যবহারে আধুনিক জগতে সর্ব প্রথম রঙিন পোস্টার আর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন ধাঁচের বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে ফরাসি চিত্রশিল্পী জুলেসেরে। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ ফ্রান্সে তাঁর নিজের লিথোগ্রাফিক প্রেস থেকে প্রথম রঙিন বিজ্ঞাপনী পোস্টার বের করেছিল।

তারপরেই তিনি থিয়েটার মিউজিক হল, রেস্তরাঁ এবং আরও অজস্র রকমের জিনিসপত্রের বিজ্ঞাপনের জন্য নানান প্রকার রূপ রেখা বেঁধে দিয়েছিল শিল্পী জুলসেরে। সেটা হলো রঙিন ছবির সঙ্গে খুব কম লেখার সমন্বয় ঘটিয়ে এমন একটি ভিস্যুয়াল জিনিস দাঁড় করেছিল যা খানিকটা দূর থেকেই সে বিজ্ঞাপন গুলো লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে পারতো। পথচারীরাও সে বিজ্ঞাপনটিতে কি বলতে চেয়েছিল তা একঝলকে দেখেই, খুব দ্রুত

বুঝে নিতে পারতো। অর্থাৎ জ্বল জ্বলে রঙিন ফর্ম, জোরদার লাইন এবং স্পষ্ট অক্ষর মিলিয়ে মিশিয়ে জুলসেরেই তৈরী করেছিল যুগসেরা শ্রেষ্ঠ ম্যুরাল। বিজ্ঞাপন বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন একজন শিল্পী আরও যে সব অপরূপ পোস্টার অংঙ্কন করেছিল সেগুলো শৈল্পিক বিজ্ঞাপনে সমাদৃত হয়েছিল এক কথায় সারা দুনিয়া। আসলে তখন বিজ্ঞাপন শিল্পীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞপ্তি জিনিস পত্রের কাটতি।

এই বিজ্ঞাপনের সাহায্যেই ব্যক্তি তথা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রয়োজনকে অত্যাবশ্যক করে তোলেছিল পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন স্থানের অনেক বড় বড় শিল্প কারখানা। তার সাথে সাথেই বলা যায়, নতুন পন্যদ্রব বাজার জাতের জন্যই বিজ্ঞাপনের জরুরি প্রয়োজন হয়ে উঠে। সুতরাং বলাই চলে, সর্ব প্রথম আকর্ষণীয়ভাবে যে বিজ্ঞাপনটি বেরিয়েছিল সেটি ১৪৮০ সালে, তা লন্ডনে ছাপা হয়েছিল। এমন এই

বিজ্ঞাপন পৃথিবীর ১ম স্বার্থক বিজ্ঞাপন বলেই শিল্পী জুলসেরে বিশ্বের এই লন্ডন স্হান টিকে বিজ্ঞাপন শিল্পের জন্মস্থান বলেছিল। বিশ শতকের বিজ্ঞাপন শিল্প এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। তার সাথে সাথেই মানুষের শিল্প বোধের বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। সুতরাং বলাই যায়, বিজ্ঞাপন শিল্পের কদর আরও দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন শিল্পের ইতিহাস টানার সঙ্গে সঙ্গে মনে করি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভৌগলক অবকাঠামো উঠে আসে বৈকি। সত্যিকার অর্থে যদি দেশীয় রাজনৈতিক পাশাবলদ গুলিকে বাদ দেওয়া হয় এবং যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যায়, তবে দেখা যাবে ভারত উপমহাদেশে ইন্ডাস্ট্রিজ বা শিল্প কারখানা যখন শুরু ঠিক তখনই বিজ্ঞাপন শিল্পের সূচনা।

যে সব জায়গায় ক্রেতারা ছিল সেসব জায়গায় বিজ্ঞাপন প্রথা শুরু হয়েছিল। তাদের পন্যদ্রবকে পরিচিতি করার জন্যেই বা খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। সুতরাং সে অর্থে ঘটা করেই বলা যায়, ভারতে যখন বিজ্ঞাপনের সূচনা হয়েছিল ঠিক তখন থেকে বর্তমানের এই বাংলায় বিজ্ঞাপন শিল্পের শুরু হয়।

বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন শিল্পের শুরু জোরদার ভাবে এখন বলাই যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে অর্থাৎ ইংরেজদের হস্তগত হওয়ার পরপরই বৈকি। এদেশে তখন অনেক সস্তায় প্রিন্ট মেশিন অথবা বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি নিয়ে আসে বিলাত থেকে ইংরেজরা। তখন থেকে এদেশীয় সামান্তবাদ প্রভূরা বা বাবু শ্রেণীর লোকেরা খুব বেশি উৎসাহী হয়ে উঠে। তারা বিলাত থেকে আসা শিল্পী বা কারিগরদের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করে। সেই সময়েই শিল্পীদের নাম, ঠিকানা সহ তাদের পরিচয় তোলে ধরার জন্যেই এক প্রকার
ব্যক্তিগত কৌশলেই বলা যায় বিজ্ঞাপন শিল্প নির্মাণ করেছিল।

এডভারটাইজিং আর্ট বা বিজ্ঞাপন শিল্প আসলে সে সময় সম্পূর্ণ রূপেই মুদ্রণ যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল ছিল। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে “সচিত্র বাংলা” বইয়ের প্রথম সাক্ষাতেই পাওয়া যায়। এমন এই বই যা, গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য দ্বারা প্রকাশিত হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে বাংলাদেশে।

তারপর এলো বৃটিশ আমল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারত ও বাংলাদেশের মিত্র বাহিনীর স্বপক্ষে বহু পোস্টার লিফলেটের ভূমিকা এদেশে নতুন একটি ট্রেন্ড তৈরী হয়, তা ইংরেজদের প্রভাবে। ভারতীয়দের চৌকস দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারাই পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস জাতীয়তা বোধ গড়ে তুলতে এমন এই বিজ্ঞাপন শিল্পের নানান প্রচার প্রচারণার প্রসারতা লাভ করে।

১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগের ফলেই শিল্প কারখানার সিংহভাগ পড়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। পন্যের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন শিল্পের মূল অফিস গুলো পশ্চিম পাকিস্তানে থেকে যায়। তাই সে সময়ে মুসলিম তরুণ শিল্পী কলকাতা থেকে ঢাকায় আসে।

তৎকালীন গোড়া ইসলামী পাকিস্তান সরকার এবং শাসকের বিরুদ্ধে শিল্পের ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা, বাংলাদেশের উন্নতির স্বার্থেই শিল্পকলার প্রয়োজন যে আছ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের বোধগম্য হয়েছিল এবং তিনি বিজ্ঞাপনী পোস্টারে প্রতিবাদী হয়েছিলেন।

১৯৪৮ সালে আর্ট স্কুল স্থাপিত হলেও বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন শিল্পের চাহিদা খুব কম ছিল। বলা যায়, লোক সংখ্যার তুলনায় শিল্পকারখানা কম থাকার ফলে পন্যের উৎপাদন তুলনা মূলক চাহিদা অনেক বেশী থাকার কারণে নতুন পন্যদ্রব্য বাজার সৃষ্টি করতে বেশি বেগ পেতে হতো না।

এই কারণেই তখন বিজ্ঞাপন শিল্পের প্রতিযোগিতা কম ছিল। তাই একই ধরনের মনোপলিশি অথবা নিজ খেয়াল খুশি মতো ব্যবসা করে যেতো। আবার পাকিস্তান আমলে ৬০ দশকের বিজ্ঞাপন শিল্পকে লক্ষ্য করলে সেসময় বিজ্ঞাপন প্রচার বাংলাদেশে যতটুকুই হয়েছিল, তা শুধুই শিল্পপতিরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে করেছে।

এমনকি দৈনিক পত্রিকা গুলির বিশেষ সংখ্যা এবং সামলিম্যান্ট প্রিন্টের আগ মুহুর্তের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হতো পশ্চিম পাকিস্তানে দিকে। তবে সে সময়ের বাংলাদেশে দু’তিনটি বিজ্ঞাপন সংস্থার নাম উল্লেখ করা যায়। যেমন, এভার গ্রিন পাবলিসিটি কামআর্ট,গ্রিন ওয়েজ,এডভারটাইজিং কর্পোরেশন।

তারা প্রসাধনী পন্যের প্যাকোডিজাইন থেকে শুরু করে প্রেস লে-আউট পর্যন্ত করেছে। এই সাফল্যের পাাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনও করেছে। ১৯৭১ সালের পরই বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন শিল্পের প্রচার মাধ্যমগুলির উন্নতি যেন চোখে পড়ে। বিশেষ করে অডিও ভিস্যুয়ালের অনন্য অবদানের জন্যই বলা যায় যে, দেশীয় টিভি, রেডিও, আপসেট প্রিন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে চলে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা। দুটি উদাহরণ দিয়েই বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সুস্পষ্টভাবে বিজ্ঞাপনের সিংহ ভাগ জায়গা দখল করে রেখেছে সরকারী দর পত্র বিজ্ঞাপন গুলো। কোনও শিল্প উন্নত দেশের দৈনিক পত্রিকা গুলোতে দেখা যাবে, শিল্প পতিদের পন্যের প্রচারের প্রতিযোগিতায় বিজ্ঞাপন আধিক্য। সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথেই ক্রেতাদের মনো ভাবের উপরে খুব প্রভাব বিস্তার করে।

গ্রামাঞ্চলের মানুষ দৈনন্দিন উৎপাদিত পন্যদ্রব জনসাধারণের নিকটবর্তী করতে ব্যর্থ ছিল। বলা যায় এক যুগের মতো সময় লেগেছিল দেশের সকল মানুষের কাছে পৌঁছাতে এবং তা সম্ভব হয়েছিল বিজ্ঞাপন শিল্পে র বদৌলতে। অবশ্য কলকারখানার কারিগরি পদ্ধতি অনেকাংশেই পরিবর্তন ও তার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পরিবর্তনেরই বিজ্ঞাপন ধারার অনেক উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশের মুদ্রণ যন্ত্রের ব্যবহার অনেকাংশেই যেন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তাই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ফটোকম্পোজ, ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশন এবং রি-প্রোডাকশন এর নতুন পদ্ধতি চালু করে বাংলাদেশকে এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে বলা যায়। যার পরিপেক্ষিতে লেজার প্রেস, আপসেট এবং ফ্লোক্সওগ্রাফির অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন কাজের সমন্বয় ঘটিয়ে বহু ধরনের বিজ্ঞাপন নির্মাণ হচ্ছে। বর্তমানে আজ বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি আগমনেই ত্বরান্বিত হচ্ছে বিজ্ঞাপন শিল্প।

আর এই শিল্পের সিংহভাগ পন্যদ্রবের উৎপাদনকে কাজে লাগিয়ে। আবার সামাজিক যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই উন্নতিশীল ডিজিটাল বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা সমৃদ্ধশালী ও পরিচ্ছন্ন হওয়াতেই বিজ্ঞাপনের আধিক্য অনেক বেশি। লেখক-নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।

রাবার ড্যাম দিনাজপুরের জলপ্রপাত

লেখক- রিয়াজুল ইসলাম.দেখে মনে হতে পারে কোন জলপ্রপাত। প্রায় ১০ ফুট উঁচু হাওয়ায় ফুলানো রাবারের বেলুনের উপর দিয়ে প্রচন্ড গর্জন ও তীব্র বেগে আছড়ে পড়ছে জলধারা।

জলপ্রপাত যারা দেখেননি, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর এর কাঁকড়া নদীতে সেচ কাজে নির্মিত রাবার ড্যামের অবিরাম জলবর্ষনকে তারা জলপ্রপাত মনে করতে পারেন। এই রাবার ড্যাম প্রকল্প শুস্ক নদীর দু’কূলের প্রায় ৫ হাজার কৃষক পরিবারের ৫০ হাজার মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, পাশাপাশি কর্মসংস্থান হয়েছে আরো ১০ হাজার মানুষের।

জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এলাকায় এনেছে নান্দনিক সৌন্দর্য। যা কেও দেখে হয়ত মনে মনে দেশাত্মকবোধক গানের দু/এক কলি গুন গুন করে উঠবেন।
যদিও কৃষকদের চাষাবাদের বিষয়টি চিন্তা করে ২০০১ সালে কাঁকড়া নদীর উপরে দিনাজপুর এলজিইডি ৮ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১৩০ ফুট দীর্ঘ রাবার ড্যামটি নির্মান করে। এই রাবার ড্যাম নির্মানের ফলে চিরিরবন্দর উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আত্রাই ও কাঁকড়া নদীর ১০ কিলোমিটার এবং পাশ্ববর্তী ১২ কিলোমিটার কয়েকটি শাখা খাল বছরের পুরো সময় পানিতে ভর্তি থাকে। ২ হাজার ২০৫ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় এসেছে।

কুশলপুর, খোচনা, পশ্চিম সাইতাড়া, দক্ষিণ পলাশবাড়ী, উত্তর ভোলানাথপুর, আন্দারমুহা, অমরপুর, ভিয়াইল, কালিগঞ্জ, তালপুকুর, পুনট্টি, উচিতপুর, তুলসীপুর, নারায়নপুর ও গোবিন্দপুর গ্রামের ৪ হাজার ৯৫০ জন কৃষক ড্যামের পানি তাদের জমিতে সেচ কাজে ব্যবহার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

এ অঞ্চলের জমি উর্বরা হওয়া সত্বেও সেচের অভাবে অনাবাদি ছিল। রাবার ড্যাম নির্মিত হওয়ায় এখন নিয়মিত ৪টি ফসল হচ্ছে। আমন, ইরি, আলু, সরিষা, ভুট্টা, গমসহ অন্যান্য ফসলের চাষ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। নদী ও খাল থেকে পানি তুলে কৃষকেরা অনায়াসে জমিতে সেচ দিচ্ছেন। আগে এক বিঘা জমিতে ১৫ থেকে ২০ মন ধান উৎপন্ন হত। রাবার ড্যাম হওয়ায় সেচ সুবিধার কারণে এখন প্রতি বিঘায় ৩৫ থেকে ৪০ মন ধান উৎপন্ন হচ্ছে। ফলে পরিবার পরিজন নিয়ে তারা সুখে দিন কাটাচ্ছেন। এসব কথা জানালেন কৃষক মন্টু চন্দ্র রায়, পরেশ চন্দ্র রায়, মশির উদ্দিন, চন্দ্র মোহন বাবু, মহেন্দ্রনাথ রায়, আবুল কালাম।

রাবার ড্যাম প্রকল্প পরিদর্শন করে দেখা গেছে, উত্তর থেকে দক্ষিন দিকে বহমান কাঁকড়া নদীর উপরে রাবার ড্যামটি নির্মিত হওয়ায় নদীর উত্তর দিকে যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কোথাও ১৫ ফুট আবার কোথাও ২০ ফুট পানির গভীরতা। দেখে মনে হয় যেন বর্ষাকালের পানিতে টইটম্বুর নদী। গাঢ় সবুজ রঙের পানিতে ছুটে চলছে ছোট-বড় অনেক নৌকা। এসব নৌকা দিয়ে মানুষ ঘাটে ঘাটে পারাপার হচ্ছে এবং মাছ ধরার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। রাবার ড্যামের উপরে একটি ফুট ব্রীজ ও পাশে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে সিমেন্ট কংক্রিটের মনোরম ছাতা, বসার বেঞ্চ ও বাংলো টাইপ ঘর নির্মিত হয়েছে।

রাবার ড্যাম প্রকল্প এ এলাকার চিত্র বদলে দিয়েছে। রাবার ড্যামের তীরে গড়ে উঠেছে বাজার। এই বাজারে হোটেল, মনিহারী, চিকিৎসালয়, সার, কীটনাশক, জ্বালানীসহ সব ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রায় ২শ দোকান গড়ে উঠছে। ফলে এলাকার একটি বড় অংশের মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

রাবার ড্যামের উপরে ফুট ব্রীজ নির্মিত হওয়ায় সাইতাড়া, আব্দুলপুর ও আউলিয়াপুকুর এলাকার মানুষের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই রাবার ড্যাম প্রকল্প এলাকা। কাঁকড়া নদীতে নিয়মিত নৌকা চলাচলের কারণে নদীর উভয় পাশের মানুষ যাতায়াতে উপকৃত হয়েছেন এবং নদীতে প্রচুর মাছ চাষ হচ্ছে। প্রায় ২ হাজার জেলে পরিবার ড্যাম এলাকায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ সিকান্দার আলী জানান, প্রতিদিন দর্শনার্থীরা রাবার ড্যাম প্রকল্প পরিদর্শনে আসছেন।

এছাড়াও শীত মৌসুমে এখানে অনেক পিকনিক পার্টি এসে থাকে। রাবার ড্যাম প্রকল্প শুধু কৃষকদের ভাগ্যই বদলায়নি, ওই এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশে বিরাট ভারসাম্য এনেছে এবং জীব বৈচিত্র্য রক্ষা পাচ্ছে। নদীর দু’কূলে বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য গাছ হওয়ায় গোটা এলাকা পাখির কলকাকুলিতে মুখরিত থাকছে। মানুষের জীবনধারা বদলে দেয়া কাঁকড়া নদীর রাবার ড্যাম প্রকল্প শুস্ক মৌসুমে কৃষকদের আর্শিবাদে পরিনত হয়েছে।

রাবার ড্যাম প্রকল্পটি আশাতীত সাফল্য পাওয়ায় দিনাজপুরের সদর উপজেলার কাঞ্চন নদীতে এবং সেতাবগঞ্জ উপজেলার টাঙ্গন নদীতে আরো দুটি রাবার ড্যাম নির্মানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।